একটি ছোট্ট ভুতের গল্প



একটি ছোট্ট ভুতের গল্প

তানভীর মেহেদী


ভৌতিক ব্যাপার গুলু সবসময় নাটকিয় হয়। ভুতেরা কি নাটক করতে ভালবাসে মানুষের সাথে। আপনি যখনি কোন মানুষের কাছে ভুতের গল্প শুনতে চাইবেন তিনি আপনাকে এমন নাটকিয় একটি গল্প বলবে যে শুনার পর হয় আপনার পশম খারা করা ভয় লাগবে না হয় আপনার মনে হবে পুরু কাহিনীটাই বানানো গাজাখুরি গল্প। ভুতেরা আবার এমন করে নাকি। এখন কথা হলো, ভুতেরা কি করে না করে, কিভাবে বাস্তব সম্মত ভাবে ভয় দেখায় সব যদি মানুষ জেনে ফেলে তবে ভুতেরা আর ভয় দেখিয়ে মজা পাবে না। ভয় দেখানোর জন্য নিশ্চই ভুতেদের একটি নীতিমালা আছে, যা তাদের জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতি ক্রমে পাশ করা হয়েছে। কোন ভুত যদি নীতিমালার বাইরে গিয়ে আপনাকে ভয় দেখায় তবে সেটিকে নীতিমালা অনুযায়ী কল্লা কাটা হবে, তখন তার নাম হবে গলা কাটা ভুত। ভুত সমাজে তার আর কোন সম্মান থাকবে না। তাকে করা হবে ভুত সমাজ থেকে বিতারিত। হয়ত এমন কোন কঠিন নীতিমালার কারনে ভুতেদের ভয় দেখানোর ব্যাপার টা এতটা নাটকিয় হয়ে গেছে। তারা নানা ধরনের প্রহসন ব্যবহার করে আপনাকে ভয় দেখাবে। যে শুধু সেই ভুতের খপ্পরে পরবে শুধু সেই ভয় পাবে, বাকিদের সবাই কেউ ভয় পাবে আবার কেউ মজা পাবে। 


ভুতেদের এ ধরনের নীতিমালা অনেকটা পুরাতন হয়ে গেছে। এখন আর তাদের এ ধরনের নাটকিয় শরীর হীম করা ঘটনায় কেউ ডরায় না, কেউ কেউ ভয় পাইলেও অনেকে ভুতেদের নিয়ে রশিকতা করা শুরু করে। তাই ভুত সদর দপ্তরে উচ্চ পদস্ত ভুত কর্মকর্তা গন ভুতেদের ভয় দেখানো নীতিমালা নিয়ে বৈঠকে বসতে যাচ্ছনে কিছু দিনের মধ্যে। সেখানে একটি বাস্তব সম্মত নীতিমালা প্রনয়ন করা হবে আর সেটি খুব দ্রুতই ভুত সংসদে পাশ করিয়ে কার্যকর করার ব্যাবস্থ্ গ্রহন করা হবে। 


এখন আমরা দেখি গল্পের আসল দিকটা। আজকে আপনাদের যে গল্পটা বলতে যাচ্ছি সেটি কিছুটা ভুতুরে আর কিছুটা মনস্তাত্তিক। আমি এই ঘটনার আজও কোন কুল কিনারা খুজে পাই নাই। আমার সাথে যে ঘটনাটা দিনে দুপুরে ঘটে গেছে, সেটি যদি দিনে না ঘটে কোন গভীর রাতে ঘটত তবে আমি হয়ত ভয়ের চোটে বাবাগো মাগো মরে গেলাম গো বলে চিক্কুর পেরে পুরু মহল্লার মানুষের রাতের ঘুম হারাম করে দিতাম।


ঘটনাটা পুরুটাই মানস্তাত্তিক। তার সাথে হয়ত কিছুটা ভুতুরে ব্যাপার মিশে আছে। আমি হুমায়ুন আহমেদের মিশির আলী সিরিজের সব গুলা বই কদিন ধরে পরছিলাম। একটার পর একটা পড়েই যাচ্ছি, এসব বই পড়তে পড়তে আমার নিজের মনের মধ্যে এক ধরনের মানসিক বোধ কাজ করা শুরু করলো যে, মানুষের মন ব্যাপার টা আশলে তেমন কোন ছোট একটা ব্যাপার না। মানুষের মনের সাথে খুব শক্ত হয়ে লেগে আছে মানুষের মাথা। আসলে মানুষের মাথাই সব কাজ করে, মনের দ্বারা মানুষ কিছু করতে পারে না। মাথা যা বলবে মন সেটাই করবে, আপনি ভাবছেন আপনি মন থেকে কাজটি করছেন, আসলে না আপনি কাজটি করছেন আপনার মাথা থেকে। মানুষের মাথা যেমন আপনাকে দুনিয়ার সব থেকে বড় বিঙানী বানাতে পারবে, তেমনি আপনাকে সেই মাথাই সব থেকে বড় বড় নিকৃষ্ট কাজ করিয়ে নিতে পারবে। 


কিছুদিন ধরে মিশীর আলী সিরিজের বই সমুহ পড়তেছি। মাথার সারাক্ষন নানা ধরনের আদি ভৌতীক আর মনস্তাত্তীক বিষয় ঘুরপাক খাইতেছে। দুনিয়ার সব কিছুর মধ্যেই কেমন এক ধরনের সন্দহে তৈরী হইতেছে, সব কিছুর বাহিরে দিক দেখার বদলে আমি ভিতরের দিক সমুহ দেখা শুরু করে দিছি। ঠিক এমনি সময় ঘটে গেলো ঘটনা টা। যার কোন ধরনের ব্যাখ্যা আমি এখনও ঠিক মত পাই নাই। 


ঘটনাটা হলো একদিন দুপুরে। দুপুরের খাবার দাবার কিছুক্ষন আগে শেষ করেছি। এখন শরীরটা কেমন কেমন লাগতেছে। মনে হচ্ছে চারিদিক থেকে রাজ্যের ঘুম আমার চোখে মুখে চলে আসছে। এখন কিছুতেই আর চোখ খোলা রাখা যাবে না। বিছানায় গিয়ে কোনরকম বালিস টেনে মাথাটা রেখে দিলেই আমি হারিয়ে যাবো ঘুমের দেশে। আর সাথে সাথেই আমার ঘুমের দুয়ার খুলে গেলো। ঘুমের দেশে প্রবেশ করার সাথে সাথে আমার সামনে খুলে গেলো নতুন এক দুনিয়া। সে দুনিয়ায় আমি যে একা সেটা কিন্তু নয়। আমার আশেপাশে দেখলাম নানা ধরনের মানুষ, তাদের কাউকেই আমি চিনতে পারছি না। আমি ততক্ষনে কিভাবে যেনো বোঝে গেছি যে আমি আর পৃথিবীতে নেই, আমি স্বপ্ন দেখছি। এখন শুধু দেখে যাবার পালা, এখানে কেউ আমার কোন ক্ষতি করতে আসবে না। সবাই নিজের নিজের কাজে খুব ব্যাস্ত। কেউ আমার দিকে তাকিয়ে দেখছে না। আমিও হেটে চলছি নিজের মনের মতো করে। আমি একটা বাজারে চলে আসছি। বাজারটা আমাদের শহরের কোন সাধারন বাজার না, মনে হচ্ছে খুব পুরাতন বা দু-তিশত বছর আগের কোন বাজার । এখানে সব ক্রেতা বিক্রেতাই গরিব, তাদের পরনে খুব বেশি কাপরের বালাই নাই। সবাই খুব হৈ চৈ করে বাজার করতেছে, তাদের কথা গুলু আমার কানে আসছে। তারা ঠিক স্পষ্ট বাংলা ভাষায় কথা বলতেছে। আমি হেটে হেটে একেবারে বাজারের শেষ সীমানায় চলে আসছি, এখান থেকে আর কোথাও যাওয়া যাবে না। আমি আর সামনের দিকে এগুতে পারছি না। তারপর আবার পিছনের দিকে হাটা দিলাম। পিছনের দিকে হাটতে হাটতে দেখলাম একটি ছুরি কাস্তের দোকান। দোকানে নানা ধরনের সৌখিন ছুরি কাচি সহ নানা ধরনের লোহার হাতিয়ারে ভর্তি। আমি দোকানটা দেখে খুব বেশি আগ্রহীত হলাম। আস্তে আস্তে হেটে দোকানদার এর কাছে গেলাম। দোকানদার আমাকে দেখে বলল-


-ভাই কি নিবেন। আমার দোকানের ছুরি তরবারি মুঘল বাদশাহ আকবরের যোদ্ধারা ব্যাবহার করে।


-আমি তখন তাজ্জব হয়ে গেলাম। হা করে থেকে তাকে প্রশ্ন করলাম ভাই আকবর আসবে কই থেকে? সেতো অনেক বছর আগের ইতিহাস।


দোকানদার মানুষটি আমার দিকে খুব করা নজরে তাকিয়ে বলল,


-আপনি বলেন কি, আপনি সম্রাট আকবরের দেশে থেকে বলেন আকবর অনেক পুরাতন ইতিহাস, আপনি কি পাগল নাকি?? একথা যদি কেউ শুনে আপনার গর্দান যেতে পারে। 


আমি কথা শুনে খাম্বার মতো দাড়িয়ে রইলাম, আমি কি স্বপ্নে কয়েক শত বছর পিছনে চলে আসছি, তা না হলে আকবরের আমলে আমি কি করে আসলাম। আশেপাশে আরো ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম আমি আমার যুগে যা দেখি এখানে তার কিছুই নাই। সব খুব পুরাতন আমলের জিনিস পত্র। রাস্তায় গাড়ির বললে ঘোড়ার গাড়ি, গরুর গাড়ি। মানুষের পরনের কাপর সমুহ সব পুরাতন আমলের ছেড়া আর ময়লা। শুধু আমার শরীরেই আধুনিক পোশাক।


আমি আর কিছু বললাম না ভয়ে, লোকটি রক্ত চোখে রাগি হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, আমি বললাম


-আচ্ছা আমি কি আপনার দোকান থেকে কিছু কিনতে পারি?


-লোকটি বলল আপনার যা পছন্দ হয় আপনি আমার দোকান থেকে নিতে পারেন।


আমি একে একে মনযোগ দিয়ে দোকানের নানা ধরনের ছুরি কাচি, বল্লম, তরবারি দেখতে লাগলাম। দেখতে দেখতে আমার চোখ গিয়ে ঠেকলো একটি ছুরির দিকে। ছুরিটির হাতলের শেষ মাথায় স্বর্নের ঘোড়ার একটি মুর্তি, আর দেখলাম ছুড়িটির গায়ে তেমন কোন ধার নেই, সব ছুড়ি চকচক করলেও এই ছরিটিই চকচকে না, মনে হচ্ছে এই ছুরি দিয়ে কিছুই কাটবে না। আমি দোকানদারকে আবার প্রশ্ন করা শুরু করলাম।


-আচ্ছা এই ঘোড়ার মাথার হাতল ওয়ালা ছুরিটি আমার খুব পছন্দ হয়েছে, কিন্তু এতে কোন ধার দেওয়া হয় নাই কেনো? সব ছুরিই চকচক করতেছে, কিন্তু এটি কেনো করতেছে না? আমাকে এই ছুরিটি ধার দিয়ে দিন ভালো করে।


-আপনি যে ছুরাটি নিয়েছেন সেটিতে কোন ধার দিবার দরকার হবে না, ধার ছাড়াই এটি দিয়ে সব কিছু কাটা যাবে, আপনি এটি নিয়ে যান ।


-আমি বললাম, আরে কি বলেন? কোন রকম ধার ছাড়া এটি কি করে কোন কিছু কাটবে??


-দোকানদার বলল, আপনার কি বিশ্বাষ হচ্ছে না যে কোন রকম ধার ছাড়া এই ছুরিটি দিয়ে কোন কিছু কাটবে?


-না আমার একটুও বিশ্বাস হচ্ছে না, আপনি আমার সাথে মিথ্যা বলতেছেন ।


-আমি আপনার সাথে মিথ্যা কেনো বলবো, আপনার যদি বিশ্বাস না হয় তবে আসেন আমি আপনাকে প্রমান দেই যে কোন রকম ধার ছাড়া এটি দিয়ে কাটে।


-কিভাবে প্রমান করবেন এটি আপনি?


-আপনার হাতটা আমার দিকে একটু বাড়ান ত দেখি ।


আমি আমার ডান হাতটা লোকটার দিকে বিনা সংকোচে বাড়িয়ে দিলাম, লোককটি আমার হাত ধরে কিছুক্ষন কি যেনো ভাবলো, তারপর আমার হাতের একটি আংগুল চেপে ধরলো, আংগুল চেপে ধরার পর আংগুলের মাথায় পেটের উপর ছুড়ির চোখা মাথাটা দিয়ে আমার আংগুলে একটি টান দিলো। সাথে সাথে আমার আংগুলের মাথা দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে এলো, আর আমি ব্যাথায় কুকরে যেতে লাগলাম। চিৎকার করতে লাগলাম। আমি নিজের চোখে দেখছি আমার আংগুল দিয়ে টপ টপ করে রক্ত পরতেছে।


-আরে আপনি এটা কি করলেন, আমার হাত কেটে দিলেন?


-আপনাকে প্রমান দেখানোর জন্য আপনার হাতের আংগুল কাটা হলো, না হলে ত আপনি আমার কথা বিশ্বাষ করছিলেন না, তাই প্রমান দেখালাম।


-তাই বলে আপনি আমার হতের আংগুলে ছুরির পোছ মারবেন??


-বেশি কথা বলবেন না, এখান থেকে তারাতারি চলে যান।


আমি তখন আমার হতের আংগুল চেপে ধরে চারদিকে অসহায়ের মতো তাকাতে থাকলাম, আংগুল দিয়ে রক্ত পরতেছে আর ব্যাধায় আমি চিৎকার করতেছি।


প্রচন্ড ব্যাথা নিয়ে আমি লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসলাম। না ভয় পাবার কোন কারন নেই, আমি আমার বাসাতেই আছি, আমি দু-তিনশত বছর পিছনে চলে যাই নাই। ঘড়ির দিকে তাকাইলাম চারটা পয়ত্রিশ বাজে, আমি ঘুমাইছিলাম ঠিক ২ টা ৪০ মিনিটের দিকে। নিজেকে নিরাপদ মেন করে আমি খুব শান্তি পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছে নরকের দুয়ার থেকে নিজের প্রানটা নিয়ে ফিরতে পেরেছি ।


ঠিক তখনি ডান হাতের দিক থেকে একটি সুক্ষ ব্যাথা আমার মাথায় জানান দিলো। আমি আমার ডান হাতের কোন এক জায়গাতে ব্যাথা অনুভব করছি। ঘুজতে লাগলাম ঠিক কোথা থেকে আমার এই সুক্ষ ব্যাথা টা আসছে। ডান হাতের দিকে তাকিয়ে আমি প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেলাম। একি ডান হতের আংগুলের মাথাটা কাটা, সেখান থেকে রক্ত পরছে একটু একটু। এটা দেখার পর বিকেল বেলাতেও আমার সারা শরীরে ভয়ে ঘাম দিলো। 


লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে আংগুলে এ্যান্টিসেপটিক মলম লাগালাম। তখন ভাবতে শুরু করলাম স্বপ্নে ঠিক যে স্থানে আমার আংগুলটি কাটা হয়েছিলো ঠিক সে স্থান থেকেই রক্ত বের হচ্ছে। এটা কিভাবে সম্ভব, স্বপ্নের ঘটনা কিভাবে বাস্তবে এসে ধরা দিলো। আদি-ভৌতিক এক চিন্তা আমার মাথায় ঠুকে গেলো। স্বপ্নে এক লোক আমার হাতের আংগুলে ছরির সুচালো মাথা দিয়ে পোছ দিয়েছিলো, আর সেটি স্বপ্নেই শেষ হয়ে যাবার কথা। ঘুমের মধ্যে আমার হাতের আংগুল কি করে কাটলো, কে কাটলো, কিভাবে কাটলো। দেখলাম বাসার সবাই ঘুমাচ্ছে অন্য রোমে, আমার রোমের জানালা গুলা খোলা, জানালার পর্দা গুলি বাতাসে উড়তেছে, সব কিছু স্বাভাবিক। কিন্তু আমার হাতের আংগুলটির মাথায় ছুরির বা ব্লেটরে পোছটা দিলো কে???  


তারপর সন্দেহ প্রবন হয়ে সারা বিছানা আমি তন্ন তন্ন করে খোজলাম, কোথাও কোন ব্লেট বা এভাবে হাত কাটার মতো কোন সুচালো কিছু ছিলো না। তাহলে কাটল কিভাবে??? এই প্রশ্নের উত্তর আমি কখনই আর পাই নাই।


এই ঘটনা যদি দিনের বেলা না হয়ে রাতে হতো তাহলে আমি ঠিক কি পরিমান ভয় পেতাম সেটা আমি কল্পনাও করতে পারি না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট