শেষে বিকেল হয়ে আসতেছে, ফুটপাথ ধরে হাটতেছি, যেতে হবে অনেকটা দুরে একটা জরুরী কাজে। দুপুরের দিকে মানুষ তেমন রাস্তায় ছিলো না, কিন্তু যেই না বিকেল হয়ে আসতেছে, হুর হুর করে মানুষের ঠল নামছে রাস্তায়। নাহ এ গতীতে হাটলে ঠিক সময়ে পৌছতে পারবো না গন্তব্যে, তাই হাটার গতীটা একটু বাড়িয়ে দিলাম, কিন্তু কাজ হলো না তেমন, শহরের উদাশ কর্মঠ মানুষ গুলি আমার পথে বার বার বাধা হয়ে দাড়াইতেছে, ওদেরকে সাইড দিতে দিতে আমি নিজের সহজাত হাটাই ভুলে যাচ্ছি।
হাতের ঘড়িটার দিকে তাকালাম, নাহ সময় চলে যাচ্ছে, একটু তারাতারি না হাটলেই নয়। কিন্তু পরক্ষনেই মনে হলো হেটে কাজ হবে না, কোন একটা বাস ধরতে হবে আমাকে। দাড়িয়ে পরলাম, ডানে বামে তাকিয়ে বাস দেখতে থাকলাম, নাহ কোন বাস নাই রাস্তায়, যা সব বাস আছে সবগুলা মানুষে বোঝাই, নাক কান বন্ধ করে বাসগুলি ছুটছে, থামার কোন লক্ষনই নাই।
তারপর হঠাৎ করেই পিপ পিপ করতে করতে একটি লেগুনার আগমন, যাক বাবা লেগুনার কিছু সীট খালি আছে দেখে ক্যাংগারুর মত কতগুলু লাফ দিয়া লেগুনায় উঠে বসলাম, লেগুনার দুই সাইডের লম্বা লম্বি করা সিটগুলি একেবারে জুলুম করে বানানো হয়েছে, পাচ জন কোনরকম বসতে পারবে, কিন্তু তারা সেখানে ঠেলে ঠুলে ছয় জন বসাবেই। আমার সাড়িতে প্রথমে হয়ত পাচ জনই ছিলো, যার কারনে বসে খুব আমার পাচ্ছিলাম, কিন্তু একটু পরেই এক মধ্যবয়সী ভুড়ি ওয়ালা মানুষ হেলে ধুলে কোথা থেকে এসে সবাইকে এক ধাক্কা মেরে সরিয়ে বসে পরলেন, আমার ডান দিকে একজন ছিলো তিনি ধাক্কা খেয়েও চোখ বন্ধ করে ঘুমাচ্ছেন।
তাকে ডাকাডাকি করে কোন লাভ নাই, তাই বাম দিকে তাকালাম, বামে বসা লোকটি অনেক আগে থেকেই ধাক্কা খেয়ে আমার দিকে করুন দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছেন যেনো আমি একটু ডানে সরে বসে তাকে যায়গা করে দেই। কিন্তু যায়গা হবে না, যতই আপনি করুন দৃষ্টি দেন না কেনো, আরে ভাই আমি নিজেই্ বসতে পারছি না। লোকটি এমন করে তাকায়া আছে যেনো তার জীবন মৃত্যু এখন আমার হতে, যখনি ইসারা করে বলব ভাই সময় শেষ আল্লারে ডাকেন, শুনেই তখনি তিনি কানতে বসবেন। লোকটির করুন দৃষ্টি আর ফেলতে পারলাম না, নিজের সীট থেকে একটু ঝুকে সামনের দিকে সরে আসলাম, লোকটি তখন আমার পিছনের খালি যায়গাটায় নিজেকে কোনরকম সরিয়ে নিয়ে মিলিয়ন ডলারের একটি হাসি উপহার দিলো আমাকে। আহা একটুতেই কত খুশি হয় এ দেশের মানুষগুলা।
এইযে আপনার পা গুলি একটু সরিয়ে রাখুন ত, আমি বসতে পারছি না। কথাটা শুনার সাথে মনে হলো চারিদিকের সব কোলাহল আচমকা থেমে গেছে, কি ব্যাপার কে কথা কয়। কিছুদিন হলো বসন্ত শুরু হয়েছে বাংলার প্রকৃতিতে, বসন্তরে বাতাস গায়ে লাগায় কোকিল্ও ডাকাডাকি শুরু করেছে হয়ত, কিন্তু কোকিল কি লেগুনায় চরে ঢাকা ঘুড়তে বের হইছে নাকি, আজব ব্যাপার ত। সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম আমার নাকের ঠিক দশ ইন্চি দুরে দুইটা চোখ জ্বল জ্বল করতেছে, চোকে মুখে রাজ্জ্যের অশান্তি আর সারাদিনের ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। মাথার চুল গুলি ভিষন এলোমেলো হয়ে আছে, কিছু অংশ গালের উপর অলস ভাবে ঝুলে পরে আছে আর বাতাসে দুলতেছে।
বাসা থেকে সকালে চুলের যে বাচন-শৈলী করে বের হইছিলো শহরের ইট কাঠের জালিম দুনিয়া সব কেরে নিয়েছে, চোখের কাজল থেকে শুরু করে ঠোটের লিপস্টকি সব শুকিয়ে গেছে, শুধু এতটুকুই বোঝা যায় হয়ত হালকা রং এর কোনো লিপস্টিকই ব্যাবহার করেছিলো। মেযের গায়ের রং দেখি সাদা, একোবরেই সাদা, চেহারার নাম্বারদিলে চোখবন্ধ করে দশে দশ । গায়ে পরে আছে আবার একটা সাদা এপ্রন, ডাক্তায় নয়তো আবার, নাহ বয়স কম, ১৮ কি ২০ ডাক্তার হবে না। তবে কি মেডিকেল কলেজের ছাত্রী নাকি। নাহ তাও নয় কারন এপ্রনের কোনায় একটি কলেজের নাম লিখা, মনে হয় আজকে জীববিদ্যার ল্যাবরে ক্লাশ করে আসছে, তাই এই এপ্রন। মেয়ের কথা শুনে মনে মনে বললাম আমার পা দুইটা শরীরের সাথে নাট বল্টু দিয়া আটকানো নয়, যদি আটকানো থাকতো তবে নাট বল্টু গুলু খুলে আপনার জন্য আমার পা দুইটা কোলে নিয়া বসতাম।
এখনো তাকায়া আছে, মনে মনে আবারো বললাম আরে একটু আগে একজনকে সরে জায়গা দিলাম এখন আবার আপনি শুরু করছেন, এত সমস্যা হলে চলেন দুজনে লেগুনার ছাদে চরে বসি, ঢাকার বিকেলের বসন্ত বাতাস খেতে খেতে যাই। তারপর বললাম, আরে দেখুন ছোট একটা লেগুনা তাতে বাংলাদেশের অর্ধেক মানুষ চরে বসে আছে, তাহলে ত একটু কষ্ট হবেই, আমার পা দুটুকে আপনি কেনো খামুখা দোষারোপ করছেন। প্রতিউওরে বললো, আরে আপনি রাগ করতেছেন কেনো, শুধু বললাম একটু যায়গা দিন। আমি তাৎক্ষনাত পা দুইটা নেরে চেরে কিছুটা যায়গা বের করে দিলাম।
লেগুনা হেলে ধুলে চলতেছে, সবাই দুলতেছে, একেবারে চোখের সামনেই একটি সাদা পরী বসে ঘাড় দুলাইতেছে। বাংগালী ছেলে বলে কথা, ছলে বলে কৌশলে চোখ ঘুড়িয়ে দেখছি একটু পর পর, অন্য কোন দিকে চোখ নিবার কোন রাস্তাও নেই, এত মানুষের ভিড়ে চোখ শুধু সামনের দিকে বা নিচের দিকেই রাখাটাই জরুরী, আমি সেটাই করছিলাম, নিচের দিকে আর চোখের দশ ইন্চি সামনে বসে থাকা মানুষটির দিকে তাকানো ছাড়া আর কোন কিছুই করার নাই।
হঠাৎ খেয়াল হলো শুধু যে আমিই তাকাচ্ছি তা নয়, সেও তাকাইতেছে, মনে হয় আমি যে বার বার চুরি করে তাকে দেখতেছি তার প্রতিশোধ নিচ্ছে, হঠাৎ আবার কোকিল ডেকে উঠলো, আচ্ছা বলুনতো আমরা কোথায় আসলাম, লেগুনা থেকে ত কিছু দেখতে পারছি না। আমি নিজেও কিছু দেখছিলাম না, মাথা ঘুরিয়ে আমতা আমতা করে একটি যায়গার নাম বললাম, মনে হয় মিলে গেছে, কারন লেগুনার কেউ আমার উত্তরে প্রতিবাদ করে নাই। যাক বাচা গেলো, সুযুগ বোঝে পাল্টা প্রশ্ন করে বসলুম, আচ্ছা আপনি কোথায় নামবেন? চোখ দুটি ঘুড়িয়ে একটা যায়গার নাম বলে থেমে গেলো, আমিও বলে দিলাম, ওহহ আমিও সেখানেই যাইতেছি, আমার সাথেই নেমে পরবেন। কি মনে করে মাথাটা ডানে বামে ঘুরালো, হ্যা বললো নাকি না বললো কিছুই বোঝলাম না।
লেগুনা হেলে দুলে চলতেছে, কখনও চাকা রাস্তার গর্তে পরে যাচ্ছে আর সাথে সাথে সব ঝাকি খেযে কোমরের চিন্তায় অস্থির হয়ে পরতেছে। একবার ত ঝাকি খেয়ে আমাদের মাথায হেট লেগেই যাচ্ছিলো, কোনরকমে সংঘর্ষ থেকে বাচা গেলো, নাহলে হয়ত বিনা কারনে রেফারি লাল কার্ড দেখিয়ে দিতো। নাহ, আর কোন কথা হয় নাই, তারপর শুধু নিশ্চুপ চেয়ে থাকা, আর গন্তব্যের জন্য অপেক্ষা করা। কখন যেনো চলে আসলাম গন্তব্যে, কনট্রাকটর ছেলেটা গলা ছেরে চেচাতে লাগলো
আমি বললাম, নামুন চলে আসছি আমরা, তারপর নেমে সার্টের আগা গোরা ঠিক করছিলাম, তখনই দেখলাম, ডাক্তারনী চলে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে তার চলার পথে পায়ের আঘাতে যে ধুলা উরছে তারাও নিজেদের ধন্য মনে করতেছে, এখন আর কিছুই দেখছি না, শুধু সাদা এপ্রন আর পিছনের দিন-শেষের অগোছালো চুলের আবছা কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। তারপর নিজের রাস্তা মেপে আমিও হাটা দিলাম, দু চার মিনিটের আচানক ধেয়ে আসা বসন্তরে বাতাস আচমকাই থেমে গেলো। ঢাকায় কি কোন কোকিল নাই নাকি, হঠাৎ করেই কোকিলের ডাক শুনতে ইচ্ছে করছে।
1 মন্তব্যসমূহ
দাড়ুন লিখেছেন.......চালিয়ে যান।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ আমাদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য