শীত শেষে বসন্ত শুরু হয়েছে অনেক দিন হলো। আজকের দিনের শুরু থেকেই আকাশের হালচাল ভালো না। সারাদিন মেঘে ঠেকে আছে আকাশ, কখনও কখনও গুর গুর করে গর্জন করছে, আবার কখনও এক কোন দিয়ে সূর্য মামা ওকি মারতে চাইছে। ফাগুনের আচমকা বাতাস চারিদিক কাপিয়ে ধাপিয়ে দিচ্ছে, হঠাৎ হঠাৎ করে বাতাস ছুটে এসে চোখে মুখে রাজ্যের ধুলা ছড়িয়ে দিচ্ছে। গাছ গুলো নেড়া হতে শুরু করেছে, পাতা সব ঝরে পরে পথে লুটুপুটি খাচ্ছে। ফাগুনের আর বেশি দিন নাই, চৈত্র মাস চলে আসলো বলে। শুনলাম আজকে বিকালের দিকে নাকি নোয়াখালির দিকে তুমুল কাল বৈশাখি হইছে, ১ শিশু মারা গেছে, বাড়ি ঘড় বাতাসে উড়তেছে। নোয়াখালির ধাক্কা টা ঢাকাতেও লাগছে, হালকা বাতাস আর তার সাথে হালকা বৃষ্টি, এখন শুরু হবে তখন শুরু হবে বলে আর শুরুই হচ্ছে না, ভাব ধরে বসে আছে। এমন বিকেলে ঘড়ে বসে থাকা যায় না। ভালো হতো কোনো এক রুপবতী প্রীয়তমার হাত ধরে ঢাকার অলিগলিতে হারিয়ে যেতে। নাহ আমার সে সুযুগ নেই। যেতে হবে একটা কাজে, কাজটা বেশি জরুরী কিন্তু খুব ছোট, বেশি সময় নিবে না, দশ মিনিটেই শেষ হয়ে যাবে।
বিকেলে পথে নামার সাথে সাথেই এক রাশ ধুলা দৌড়ে এসে চোখে মুখে পরলো। ধুলা আর মরা পাতা মারিয়ে যখন বিকেলের কাজটা শেষ করে আবার চলে আসছিলাম তখন মনে হলো এক পুরাতন বন্ধুর কথা। অনেক দিন দেখা হবে হবে করেও হচ্ছে না। আজকে সময় সুযুগ দুটুই আছে, আজকেই দেখা করা দরকার। যা ভাবা সেই কাজ, তারপর পটাপট ফোন করে বন্ধুকে যানিয়ে দিলাম ডে আমি তার কাছাকাছি, দেখা করার ভালো মওকা। তার আসতে কিছুটা হয়তো সময় লাগবে, ততক্ষন বাংলার প্রকৃতির ঋতু বৈচিত্র দেখি। বিকেল শেষ, কয়েক মিনিট পরেই আজান হবে। আকাশের অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছে, মনে হয় যেকোনো সময় বর্ষন শুরু হবে। হঠাৎ হঠাৎ করে মোটা মোটা ঠান্ডা বৃষ্টির ফোটা আমার হাতে পরছে, ভয় দেখাচ্ছে, সন্ধা বেলা রাস্তায় কি, বাড়ি যাও, নয়ত ভিজিয়ে দিবো । আমি কি আর এমন প্রেমময় ভয় দেখানো দেখে বাড়ি যাই। দাড়িয়ে দাড়িয়ে টুপটুপ বৃষ্টির ফোটার আলিংগন পেতে থাকলাম। বাতাস ঝরা পাতাগুলোকে একবার এদিক টেনে নিচ্ছে আরেকবার ওদিক টেনে নিচ্ছে, ধুলা উড়াচ্ছে, মনে হচ্ছে কোনো বাচ্চা শিশু মনের খুশিতে ধুলা বালি দিয়ে খেলা করছে, বকুনি দিবার মতো কেউ নেই আজ।
দেখতে দেখতে রাস্তার হলুদ আলো গুলি চোখে স্পষ্ট হতে থাকলো, বাসের লাইট গুলো চোখে লাগলো, নাহ অন্ধকার হয়ে গেছে। বিকেল গরিয়ে এখন সন্ধা। আসছে না কেনো, একটু পরেই বন্ধু হাসিমাখা মুখে এসে আমার সামনে হাজির। খুব সুখি মানুষ সে, জীবনে কষ্ট করেছে সে তা বলা যাবে না, আবার খুব সুখে হেলে দুলে কাটিয়েছে তাও না। তবে আগে তার মুখে একটু দুঃখ দুঃখ ভাব থাকতো, এখন আর সেটা থাকে না। এখন খুব হাসি হাসি মুখ নিয়ে ঘুরে, মাঝে মাঝে মনে হয় এমন সুখের সময় যখন চলছে ধরে একটা বিয়ে দিয়ে দেই। নাহ সেটা করা যাবে না, বাচ্চা ছেলে। বন্ধুর হাত বগলদাবা করে চললুম। অনেক দিন পর দেখা হলো, আজকে ভালো মন্দ কিছু খেতে হবে।
খাবার দাবার আড্ডা কোলাকোলি যা করার ছিলো সব শেষ। রাস্তা ধরে দুই বন্ধু হাটতেছি। আজকাল ঢাকা শহরের ফাষ্টফুডের দোকান গুলাও দাড়ুন হইছে, তারা দামে কম রাখে আর খাবারে নামি দামি ভাব নেয়। তারা সাধারনত সব স্ট্রিট ফুডের দোকান। এমনি একটা দোকানের দেখা পেয়ে আমার লাজুক বন্ধু কাত হয়ে গেলো। তার আরো খেতে হবে। দোকানে কিছু কাষ্টমার আছে বটে। লাল নীল বাতি জ্বালানো আছে দোকানে। মাঝে মাঝে টুপ টুপ করে বৃষ্টি পরছে। রাতের মেঘ যুক্ত আকাশ, কিছুই দেখা যাচ্ছে না। যা হবার হবে। আগে খেয়ে নেই, আজকে মনের সুখে খাচ্ছি আমরা দুজনে।
দোকানের এক কোনে গিয়ে বসলাম টুল পেতে। পাশেই খাচ্ছে দুটি মেয়ে। তাদের পাশে দেখলাম কিছু অনার্স দ্বিতীয় বর্ষর ইকোমিকসের বই। নাহ, দুনিয়ার এই একটি বিষয় আমার সন গলাতে পারলো না, আর তা হলো মাইটি ইকোনোমিকস। এসব মানুষ কিভাবে পড়ে। কোনো রসকস ছাড়া পড়াশুনা। যারা এসব পড়ে তাদের সেলুট জানাই। মেয়েটাকে জানাবো নাকি সেলুট। হঠাৎ করে গিয়ে যদি বলি সেলুট আপনাকে, কপালে সালাম করার মতো হাত রেখে, তাহলে কি রকম হবে চেহারাটা। নিশ্চই দেখার মতো হবে। ভয়ও পাইতে পারে, আবার অন্য কিছুও হতে পারে। দুটি মেয়ে, দুজনের চেহারাই ভালো । সকালের সাজুগুজু করার প্রমান এখনও চেহাড়ায় রয়ে গেছে। দুজনেই মেকাপে আর হিজাবে পটু, নানা ভাবে ঘুরিয়ে পেচিয়ে ফুটু করে পিন দিয়ে আটকিয়ে হিজাব পালন করতেছে। তাদের হিজাব যাই হোক, এসব করতে গিয়ে ত আর পরিশ্রম কম করতে হয় নাই। গলায় দড়ি ঝুলতেছে, মানে আইডি কার্ড, কোনো প্রইভেট বিশ্ববদ্যিালয় আরকি। সারা দিনের অযথা কাজ কর্ম শেষে দুজন খেতে বসেছে আরকি। দুজনেই খাবার ধান্দায় আছে, কোন দিকে তাকাচ্ছে না। একি এদিকে তাকাচ্ছে কেনো, সেলুট দেবার মতলব টা কি ধরে ফেলল নাকি। আরে কি মুসকিল বার বার তাকাইতেছে কেন, সেলুট ত আর এখন দিতে পারবো না। যাক এসব আমি নিজের খাবারের দিকে মন দিলাম।
কিছুক্ষন পর ধুপ করে হালকা বাতাস আর মোটা মোটা বৃষ্টির ফোটা পরতে লাগলো। আমাদের মাথার উপর ছাদ আছে, মেয়ে দুটি যেখানে বসছে তাদের মাথার উপর কোনো ছাদ নেই বলে দুজনে খুব বিরক্ত আর তারাহুরা করছে। তারাহুরা করে খাবার শেষ করলো। তারপর আমার সামনে দিয়ে বিল দিতে দৌড়ালো। আমি আরাম করে ঠান্ডা বাতাস আর টুপটুপ বৃষ্টি দেখে দেখে খাচ্ছি। খাবারের বিল মিটিয়ে দিয়ে তারা দুজনে চলে গেলো। বেশি দুর যায়নাই, এখনো তাদের দেখা যাচ্ছে, এমন সময় পাশে তাকিয়ে দেখি ইকোনোমিকসের একটা বই রেখে গেছে। হাতে নিয়ে ডাকতে গিয়ে আটকে গেলাম, কারন ডাকলে শুনবে না আর, অনেকটা দুড়ে চলে গেছে তারা। পাশে বসে থাকা দুটু ছোট ভাই বলে উঠলো ভাই দৌড়ান, দৌড় দিলে ধরতে পারবেন। এমন সুযুগ আর কোনদিন পাবেন না। গিয়ে বই টা দিয়ে আসেন। একসময় ভাবলাম দেই দৌড়, দিয়ে আসি। সোয়াবের কাজ হবে। মেয়ে ত বাসায় গিয়ে বই হারিয়ে হায় হায় করবো। কিন্তু যেই ভাবলাম দৌড় দিবো তখনি দেখি তাদের আর দেখা নাই, দুজনে মানুষের সমুদ্রে হারিয়ে গেছে। ছোট ভাই দুটি ওসখুস করছিলো, পারলে তারা দুজনে আমার আগে দৌড়ায়। বই দেবার বাহানায় যদি সুন্দরী দুটি মেয়ের সাথে দু মিনিট কথা বলতে পারে। তারাও ঘুরে মেয়ে দুটিকে না দেখে হতাস হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।
বইটা খুললাম, ইকোনোমিকসের জটিল জটিল সব অংক, দেখলেই মাথা ধরে। বইয়ের ভিতরে নাম লিখা ফারজানা ইয়াসমিন রুপন্তী। ভালো নাম, সুন্দর নাম অনেক, তারা ত দুজন ছিলো, কার নাম এইটা কে যানে। খাবার শেষ করে বিল দিবার সময় দোকানদারকে বললাম, একটু আগে দুটু মেয়ে ছিলো না, তারা যাবার সময় এই বইটা ফেলে গেছে। যদি আবার ফিরে আসে তাহলে তাদের দিয়ে দিবেন। আবার বইয়ের পাতা ছিড়ে মুড়ি বেইচেন না। দোকানদার একটা হালকা হাসি দিলো। তারপর বলল আরে না ভাই, এসব করবো না। কত মানুষ কত কিছু যে ফেলে যায়। আপনি যে মেয়ের কথা বলছেন সে আমাকে একশো টাকা মনে করে পাচশ টাকা দিয়ে গেছে, আর আমিও না দেখে রেখে দিছি, এখন দেখি নোটটা একশ না পাচশ টাকার। মেয়েটা আজকে ধরা খাইছে, বই রাইখা গেছে, পাচশ টাকাও রাইখা গেছে। এই দেখেন টাকা রাইখা দিছি আলাদা করে। আবার ফিরে আসলে দিয়া দিমু, বইটাও দিয়া দিমু।
আমি হাসতে লাগলাম, মেয়েরা এত ভুলু মনের হয় নাকি আজকাল। বই না হয় না নিলো, কিন্তু ৫০০ টাকা ফেলে বাসায় যাবার মত মেয়ে হয় নাকি। বৃষ্টির ঠান্ড ফোটা মুখের উপর পরতে লাগলো। আমি আর আমার বন্ধু আবার হাটা দিলাম দোকান থেকে বের হয়ে। বসন্ত চলছে……...চলে যাচ্ছে........
0 মন্তব্যসমূহ
ধন্যবাদ আমাদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য