কালিয়াকৈরের ডাইরি

কালিয়াকৈরের ডাইরি

তানভীর মেহেদী


সালটা ২০০৯, নবম শ্রেণীতে পড়ি, তখনকার সময়ের কিছুটা সময় আমি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অতিবাহিত করেছিলাম। যায়গাটা বেশ সুন্দর, চারিদিকে ঘন শাল বন, কোথাও বড় বড় টিলার মতো পাহাড়, আবার কোথাও কোথাও বনের মাঝে মাঝে টুকরো টুকরো ধানি জমি। সেখানে ধান চাষ হয় খুবি কম, কারণ পানি সংকট। গাজীপুর অনেকটা উঁচু ভূমি, ডিপ টিউবওয়েল পানি এখানে খুব ব্যয়বহুল। এখানকার মানুষ জন আগে হয়ত ধান চাষ করতেন, এখন আর করেন না। কারণ তাদের এখন দিন বদলাই গেছে, আগে যেখানে তাদের খবর নিবার কেউ থাকতো না সেখানে আজ তাদের এলাকায় চলছে উন্নয়নের মহা জোয়ার।


চোখ দুটি যেদিকে নিবেন সেদিকেই মহা সমারোহে চলছে নতুন নতুন কল-কারখানা আর গার্মেন্টস শিল্পরে গজিয়ে উঠার কাজ। সেখানে ধেয়ে আসছে সারা দেশের সব সাধারণ কর্মজীবী মানুষ। মানুষ থাকার জন্য বাসা পাচ্ছে না এখানে। এখানকার মানুষরে এখন প্রধান কাজ নতুন নতুন বাসা তৈরি করা আর ভাড়া দেওয়া। এই দুদিন আগেইছিলও যে ছেলেটা বাপের বেকার পোলা ছিল, সে কোনরকম টিনের চালের দুইটা বাসা ভাড়া দিয়ে, হোন্ডা কিনে, হুংকার দিয়ে চাঁদাবাজি করতে নেমে গেছে এখন। একেবারে অজ-পাড়া সব গ্রাম রাতারাতি ফুলে ফেঁপে ধনি হয়ে যেতে দেখেছি আমি এখানে।


নতুন নতুন এত এত মানুষ আসতে শুরু করেছে যে শালবনের এলাকাগুলা কলকল করে উঠছে। আমি যে বাসায় থাকতাম সেটাও ছিলো একেবারে নতুন বানানো বিল্ডিং, আর আমরাই ছিলাম নতুন ভাড়াটিয়া। চারিদিকে তাকালে শহরের কোন কিছু চোখে পরবে না, শুধু গ্রামের পরিবেশ, তাও শালবনের গহীন গহীন সব বনে ঠাসা। এখানকার চেয়ারম্যান সাব নতুন বিপদে পরে গেলেন, কারণ রাত ৭ টা হলেই মেয়েরা আর নিরাপদ না এখানে, কারণ এতটাই জংগল চারিদিকে দিনের বেলা মানুষ গায়েব করে দিলেই কি। এখন একটু মানুষ বাড়ায় দু একটা বাড়ি ঘড় উঠতেছে কিন্তু তেমন কোন লাইট বা রাস্তার কাজ হয় নাই। এখানে বেশির ভাগ গার্মেন্টস, গার্মেন্টসের মেয়ে অপারেটর দের জন্যই বিপদটা বেশি, এখানকার সব ছোট ছোট রাস্তাই বড় বড় সব শালবনের ভিতর দিয়ে। যেখান দিয়ে দিনের বেলাতেই গা ছমছমে ব্যাপার ঘটে। আসলে সরকার হঠাৎ করে ঢাকা শহর থেকে সব গার্মেন্টস বের করে দিবার কারণে এই আচমকা সমস্যা হয়েছে।


মানুষ এখানে খুবি কম, স্থানীয় মানুষ খুঁজে পাওয়া একেবারেই যায় না, আমি এমনও অনেক পরিবার দেখছি, যারা ঢাকার বড়লোক পার্টির কাছে নিজেদের বাব দাদার সব ভিটে মাটি কোটি টাকায় বিক্রি করে অন্য কোথাও চলে গেছে। পাহাড়ি এই বনভূমির দাম আচানক খুব বেড়ে গেছে। আগে হয়ত ফ্রি দিলেও এমন যায়গা কিনতে আসতো না কেউ, আর এখন সেই সব জমিই কোটি টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। এখানে দুপুর বেলাতেও সূর্যের আলো মাটিতে পরতে পারে না কোথাও কোথাও।শীতের সময় প্রচণ্ড শীত আর কোনও রকম কথা বার্তা ছাড়াই তুমুল বৃষ্টি আসে এখানে। গাছপালার পরিমাণ বেশি হবার কারণেই এমন হয়।


এখানকার শাল বনের টুকটাক যায়গায় কিছু মানুষ খুপরি করে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ভাবে কিছু বাড়ি করে রেখেছে, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ফরেস্ট অফিসারদের বাংলো। সব যায়গাতেই সুনসান নীরবতা আর ঘন শালবন। তখনকার দিনগুলা আমার কাটত শুধু বনের ভিতরে ঘুরে ঘুরে, প্রতিদিন নতুন নতুন যায়গায় চলে যেতাম, নতুন নতুন যায়গা আর পরিবেশ দেখে অভাব হতাম। নতুন নতুন হঠাৎ করে খুঁজে পাওয়া কোন গ্রাম্য বাজার, বা কোন টং দোকান বা কোন ছোট খাট পাহাড় দেখে আমি হা করে তাকিয়ে থাকতাম। একদিন ত হাটতে হাটতে বনের ভিতর রেললাইন আবিষ্কার করে ফেলেছিলাম, তারপরের দিনই রেললাইন ধরে হাটতে হাটতে একটা ছোটখাটো স্টেশনও পেয়েছিলাম, ষ্টেশনের নামটা ছিলো “রতনপুর ষ্টেশন”। কোনও ট্রেনই কখনো দাঁড়াত না, সব দৌড়ে চলে যেতো। তারপর একদিন খুঁজে পেয়েছিলাম লোহা-বাবার একটা মাজার, সেই গ্রামটার নামই ছিল লোহাগড়া পরে শুনেছিলাম।এই কয়েক মাসের ভিতরেই আমি রতনপুরে আমার খুব ভালো একজন বন্ধুও তৈরি করে ফেলেছিলাম। পরে আবার যখন ঢাকায় চলে আসলাম, তার সাথে কোন যোগাযোগ করতে পারলাম না, সে হারিয়ে গেলো, আমার খুবই ভাল বন্ধু ছিলো সে, সারাদিন আমাকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াতো সারাটা কালিয়াকৈর। আমি এখনো তাকে খুঁজে বেরাই, ৭ বছর হয়ে গেছে যদিও, আবার যদি কোনদিন যাই রতনপুর বা সফিপুর, তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করবো, সেটা আমার জন্য জীবনের খুব বড় প্রাপ্তি হবে, কারণ সে এতটাই ভালো আর পছন্দরে বন্ধু ছিল সে আমার।


আরেকদিন একটা ভুতুরে বাড়ি আবিষ্কার করেছিলাম, বাড়ি না আসলে এটি একটি কারখানা। কারখানাটি হল সুতা তৈরি করার, ভিতরে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতিতে ধুলা পরে আছে, সুতার বড় বড় সব গাইড পরে আছে, নানা ধরনের সব মেশিন, সব নষ্ট হচ্ছে, এসব কিছুই সরিয়ে নিতে পারছে না মালিক। কোনও মানুষ থাকে না তার আশেপাশে। সেখানে কারখানার জানালা গুলা পর্যন্ত ইট দিয়ে মেরে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও জানালার ভাঙ্গা গ্লাসের ভিতর দিয়ে আমি কিছু কিছু ভিতরের দৃশ্য দেখতে পেয়েছিলাম। ভুতের অত্যাচারে নাকি এই কারখানার সব কর্মচারী কারখানা ছেড়েছে। সে গল্প আরেকদিন বলবো।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট