শ্রাবণ মাস চলছে, প্রতিদিনই আকাশ কাপিয়ে ঝরঝর বৃষ্টি হচ্ছে। আপনি যদি মনে করে থাকেন আহারে এমন সময়ে যদি টিনের চালের ঘড়ে বসে বৃষ্টি বিলাস করতে পারতাম মন্দ হতো না। ঢাকার পে-পু আর হই-চৈ এর রাজ্যে কি আর এসব পাওয়া যায়। না হতাশ হবেন না, ব্যবস্থা আছে। শ্রাবণের টিপটিপ টুপটুপ বৃষ্টির শব্দ শুনতে চান? নিশ্চিন্তে উঠে বসতে পারেন ঢাকার কোন লোকাল বাসে। বাসের ছাদে যখন বৃষ্টি ঝরঝর করে ঝরে পরবে, তখন আপনি তাতে টিনের চালের ফ্লেভার পাবেন গ্যারান্টি। আর আপনার কপাল যদি খুব ভালো হয় তবে বাসের ছাদের ফুটু দিয়ে আপনার মাথায় টুপ করে কয়েক ফোটা হিম শীতল বৃষ্টির জল লাফিয়ে পরে আপনাকে কিছু সময়ের জন্য রোমাঞ্চিত করে দিতে পারে। আপনি তখন দুটি বড় বড় শ্বাস নিয়ে চোখ বন্ধ করে দু-মিনিটের জন্য আপনার প্রেয়সীর মুখটি দেখেই নিতেই পারেন। আর বাসের ছাদের ফুটুর সংখ্যা যদি সামান্য একটু বেশি হয় তবে আপনার একাদশে বৃহস্পতি, নিজের সিটে বসে বসে বৃষ্টির শীতল জলে স্নান নাও সেরে নিতে পারবেন।
বৃষ্টিতে ভিজে যদি আপনার রোমান্টিকতা শেষ হয়ে থাকে তবে এবার জানালা দিয়ে একটু বাইরের দিকে তাকান। বাসের জানালা ভাঙ্গা হলে সুবিধা, টানাটানি করতে হবে না, আর যদি ভালো হয় আর লাগানো থাকে, তবে আপনাকে একটু ইয়া আলী, জোয়ান বলো হেঁইয়ো বলে টানাটানি, ক্যাঁচ-ক্যাঁচ করে জানালাটা খুলতে হবে, পাশে যদি কেউ আপত্তি জানায়, তবে তাকে একটা ভৌতিক রহস্যময় লোকস দিতে পারেন। জানালার বাইরে তাকালেই দেখবেন ঝরঝর বৃষ্টি আর নিচের দিকে পদ্মার ঘোলা পানির উথাল-পাথাল ঠেও। উথাল-পাথাল ঠেও আপনার মনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে সাথে সাথে, আপনি বাসে বসে আছেন না নৌকা ভ্রমণ করতেছেন?? তখন আপনি চাইলেই মনের সুখে গেয়ে উঠতে পারেন নজরুলের সেই বিখ্যাত গান,
“পদ্মার ঢেউ রে........মোর শূন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা, যা রে.....পদ্মার ঢেউ রে....”
গান শুনা শেষ হলে এবার একটু ডানে বায়ে তাকান, ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকার দেখা পেতে পারেন আপনার আসে পাশে। তখন যদি আপনার মনে রবি ঠাকুরের সেই বিখ্যাত কবিতাটা মনে পরে যায় তাহলে সেটাও দু লাইন আপনি আবৃত্তি করতে পারেন,
"আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে....বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে....পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি....দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি"
কবিতা আবৃত্তি করা শেষ হলে এবার একটু দৃষ্টি সীমা প্রসারিত করুন, দুরে কোথাও কাউকে চিৎপটাং হয়ে পরে যেতে দেখতে পারেন। কিছুটা হাসুন তারপর তার এই হাল দেখে নআফসোস করুন, আর নিজের কথা ভাবুন। সরকারকে আর সিটি মেয়রদের কিছুটা উচু দরের ভাষায় গালাগালিও করে নিতে পারেন। কপাল খুব বেশি ভালো হলে এও দেখতে পারেন, মাছ ধরা জাল হাতে পদ্মা নদীর কোন এক প্রাক্তন জেলে ঘোলা পানি দেখে লোভ সংবরণ করতে না পেরে আবার পুরানো পেশাটায় ফিরে গেছে, তার হাতে ধরা কোন বাঘইর, কিংবা মাগুর মাছ। এরা এই কাজে এতটাই এক্সপার্ট যে যেখানেই জল সেখান থেকেই এরা কোন না কোন প্রকারে মাছ খুঁজে বের করে নিয়ে আসবে।
নদীর দু পারের দৃশ্য দেখতে দেখেতে দেখতে যদি, ধুর কি বলি, রাস্তার দুই পারের একই রকম দৃশ্য দেখতে দেখতে যদি আপনার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে আর আপনার গন্তব্য চলে আসে, তবে তারাহুরা বা হুরমুর করে বাস থেকে নামতে যাবেন না আবার, সিটি কর্পোরেশনের করা কোন এক মাছ চাষের পুকুরে ঝুপ করে ডুবে যেতে পারেন, আর তখন সাতার না জানলে আপনাকে আর বাচায় কে।
সব সময় দেখুন শুনুন চলুন রীতি মেনে চলবেন এ সময়। কোন সময় কোন দিক থেকে আপনার উপর বিপদ চলে আসে আপনি টেরও পাবেন না। উপর থেকে ঝুম বৃষ্টি এসে আপনাকে ভিজিয়ে দিতে পারে, আবার নিচের দিক থেকে হাঁটু সমান পানির নিচে লুকিয়ে থাকা কোন খোলা ম্যান-হোল বা ভাঙ্গা রাস্তার পরে গিয়ে বেসামাল হয়ে নিজের সংঙা হারাবেন। যখন চোখ খুলবেন তখন দেখবেন হাত পা দুটাই ভেংগেছে, আর আপনি পংগু হাসপাতালের স্যাঁতস্যাঁতে বারান্দায় শুয়ে।
শ্রাবণের এই সময়টাতে হাতে সব সময় ছাতা রাখার চেষ্টা করুন, না হলে বৃষ্টির হাত থেকে আপনাকে কেউ বাচাতে পারবে না। আপনার শরীরের সব কাপর ভিজে শরীরে সাথে লেপটে গিয়ে বিচ্ছিরি কিছু ঘটনা ঘটে যেতে পারে, সবশেষে কাক ভেজা হয়ে যাবেন, দেখতে সেটা মোটেও ভালো নয়।
যদি মানে করেন ত আপনি যত খুশি ভিজে নেন, কিন্তু আপনার পকেটের মহা মূল্যবান যন্ত্রটার কথা ভুলবেন না আবার। পানিতে তার ভীষণ এলার্জি, একটুতেই দম বন্ধ করে দেয়। স্মার্ট ফোনের কথা বলছিলাম। সাথে ছোট ছোট পলি ব্যাগ রাখেতে পারেন, আর সেই ব্যাগের ভিতর দরকারি কাগজ, মানিব্যাগ আর মোবাইল ফোনটি রাখতে পারেন। তাহলে আপনি যতই ভিজুন না কেনো আপনার দরকারি সব যন্ত্র আর মানিব্যাগ টা নিউমোনিয়া হওয়া থেকে বেচে যাবে। আমার ব্যক্তিগত জীবনে আর বন্ধু মহলে এই পলিথিন থ্যারাপি বহুল ভাবে ব্যবহৃত ও জনপ্রিয়।
পকেটে যদি ফোন থাকে আর সেখানে কিছু বৃষ্টির গান থাকে তবে তা হলে সোনায় সোহাগা। তবে অন্য পকেটে আপনাকে হেড-ফোনটা রাখতে হবে, না হলে হবে না। কানে হেড-ফোন দিয়ে হাতে ছাতা ধরে গুনগুন করে হাঁটু সমান পানি মারিয়ে যদি আপনি “আজি ঝর ঝর মুখরও বাদল দিনে” গানটি শুনতে থাকেন, ত আর আপনার সুখের ঠিকানা থাকবে না আশা করি।
ঢাকা এমনি শহর, আমাদের সব কিছুতেই বিড়ম্বনা দিবে। কিন্তু সেই বিড়ম্বনার ভিতরে আপনাকে আপনার মতো করে সুখ আর আনন্দ খুঁজে নিতে হবে, যা হয়ত অন্য দেশের কোন মেগা-সিটি আপনাকে দিতে পারবে না। এই শ্রাবণের মাঝা-মাঝিতে ঢাকা আমাদেরকে শ্রাবণ বিলাস করার জন্য সুপার ধামাকাদার একটা প্যাকেজ দিচ্ছে সব মিলিয়ে, আমাদের উচিত তা লুফে নেওয়া। আর শ্রাবণ মাসের আনন্দ উপভোগ কারা। দিনশেষে রাতের বেলা যদি নাকের কোনে পানির অস্তিত্ত খুজে পান, আর হাচ্চু করে চিল্লায়া উঠেন, তবে ভয় পাবেন না, এইটা শ্রাবনের সাইড ইফেক্ট।
1 মন্তব্যসমূহ
Sounds Good
উত্তরমুছুনধন্যবাদ আমাদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য