রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই

রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই

তানভীর মেহেদী


জীবনে তো কিছুই করা হলো না, এই দেশের জন্য এই দেশের মানুষের জন্য কত মানুষ কত কিছু ত করেছে। আমি আমার এই ছোট জীবনে এখনো আমার দেশের জন্য হয়ত কিছুই করে উঠতে পারি নাই। সব সময় শুধু দেশ আমাকে হাতে তুলে কি এনে দেয় নাই সে সবের হিসাব করেছি। মায়ের কাছে সন্তানের চাহিদার শেষ থাকে না, কিন্তু এই মায়ের ভালোথাকার জন্যই যেনো আমরা সন্তানরা জীবন দিতে প্রস্তুত। 


এই ভাষা শহীদ রফিক উদ্দিন আহমেদের কথাই ধরুন না। ওনি তার ভালোবাসার মানুষ রাহেলা খানম পানু আর তার বাবা-মা কে মানিকগন্জে রেখে ঢাকার একটা ছাপাখানায় কাজ করতেন। যখন তার আগে তিনি গ্রামে ছিলেন তখন তিনি  নাকটে অভিনয় করতেন। একদিন গলি থেকে রাজপথ নাটকের সাইড ক্যারেক্টারে অভিনয় করেছিলেন রফিক। তার নাটক দেখে রাহেলা খানম পানু মুগ্ধ হয়ে বলেছিলো ক্ষুদিরাম কে নিয়ে লিখছি আমি রফিক। আর তুমি হবে আমার সে নাটকের ক্ষুদিরাম। 


গলি থেকে রাজপথ নাকটের অভিনয় শেষে রাহেলা খানম পানু আর রফিক উদ্দিন বাড়িতে ফিরছিলেন, সে দিনের রাতের অন্ধকারে ছিলো জোছনা, কুয়াশার শিশির, দুর থেকে ভেসে আসছিলো শিয়াল আর কুকুরের ডাক। রাতের জোছনায় রফিক আর পানু বাড়ির দিকে ফিরছিলেন, পানুর ঘোমটা দেয়া মুখের দিকে তাকিয়ে রফিক হয়ত ভাললাগায় হারিয়ে গিয়েছিলেন। রাতের অন্ধকার দুর করার জন্য পানুর হাতে ধরা ছিলো মিটমিট করে জ্বলতে থাকা একটি কুপি বাতি।  তখন হাটতে হাটতে একসময় রফিক তার পানুকে বলেছিলো, পানুরে এর পরের নাটকে ত ক্ষুদিরাম। আর সে নাটকে  আমাকেই অভিনয় করতে হবে, আর সেখানে আমাকে ক্ষুদিরাত সাজতে হবে। ক্ষুদিরাম সেজে ফাসিতে ঝুলতে হবে। এখনি নাটকে আমি মৃত্যুর মিথ্যে অভিনয় করলে তুমি হস্য করতে পারো না, তখন যখন ফাসির দুড়িতে ঝুলতে ঝুলতে গান গাইবো একবার বিদায় দে মা ঘুড়ে আসি, হাসি হাসি পরবো ফাসি দেখবে ভারত বাসি। তখন আমার মৃত্যু হস্য করবে কেমন করে তুমি। তখন পানুর মনের গভিরে থাকা রফিকের জন্য অপার ভালবাসার বিচ্ছুরন হয়েছিলো হয়ত, পানু তখন কাদো কাদো গলায় বলেছিলো, তোমার ক্ষুদিরাম সাজার দরকার নাই রফিক ভাই। কারন পানু চোখের সামনে রফিকের ফাসির অভিনয় দেখে সইতে পারবে না। যদিও সেটা শুধু অভিনয় ই হবে।  আর কি আশ্চার্য পানুর এই কথাটি শুনার পর মূহুর্তেই রফিকের সমস্ত অস্থিত্ত বন্দি হয়ে যায় পানুর অপার ভালোবাসার ভিতর। কারন পানু রফিকের মিথ্যে ফাসিতে ঝুলার অভিনয় টুকুও সইতে পারবে না, সেটা আগে থেকেই ভাবছিলো রফিক।


এরপর রফিক ঢাকার ছাপাখানায় চাকরি নিয়ে চলে এলো, পিছনে রেখে হলো তার বাবা-মা আর রাহেলা খানম পানু নামক এক মায়াবতীর অপার ভালোবাসা। এদিকে ঘোষনা হলো উর্দোই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ঢাকার বাতাসে বিদ্রোহের আওয়াজ ফিসফিস করতে শুরু করলো। এদিকে রফিকের সাথে রাহেলা খানম পানুর বিয়ের দিন ধার্য হলো ২৪ ফেব্রুয়ারী। ছাএরা আন্দলনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো। ছাপাখানায় বসে রফিক ভাবতে লাগলো উর্দু কেন রাষ্টভাষা হবে যেখানে আমাদের দেশের সবচাইতে বেশি মানুষের মাতৃভাষা হলো বাংলা। বাংগালিরা কেনো তবে উর্দু ভাষায় কথা বলবে, রফিক ভেবেছিলো আজ হয়ত আর মিছিলে যাওয়া সম্ভব হবে না, সে তার খালাতো ভাই মোসাররফ কে নিয়ে বিয়ের কেনাকাটা করতে বের হলো। আলতা, সাবান, চুড়ি, আয়না কিনে পানুর জন্য স্বর্ণ কিনার জন্য শাখারি বাজারে ঢুকার সময় এক রিকশা ওয়ালার মুখে শুনলো ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভংগো করেছে, বিশ্ববিদ্যালয় আর মেডিকেল কলেজের মোড়ে লড়াই বেধে গেছে, রাষ্টভাষা বাংলা চাই বলে সবাই স্লোগান তুলেছে। সেই জালাময়ি স্লোগানে কন্ঠ মিলায় রফিক। রফিকের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, গলার রগ গুলি ফুলে উঠে তিব্র ভাবে। কন্ঠস্বর আসমান বিদির্ন করতে চায়। হাতেমুঠুয় সূর্যকে ধরবে বলে লম্বা হতে শুরু করে মুষ্টি বদ্ধ হাত।


তখনি গুলির শব্দ শুরু হয়। পাশে থাকা রেইনট্রি গাছ গুলির আগা থেকে উড়ে যায় গগণ চিলের দল। ছাত্ররা তাও চিৎকার করতে থাকে। তখনি গুলি লাগে রফিকের বোকে, শিশা তার বোকের পাজর ভেদ করে ভিতরে প্রবেশ করে। তখন রফিক পায় ভাষার অক্ষরের গন্ধ, ছাপাখানার গন্ধ, তার হাত থেকে পরে যায় বিয়ের বাজার করা আলতা, সাবান আর আয়নার থলে টি। কালো পিচের উপর পরে ভেংগে যায় আলতার শিশি, লাল আলতা রফিকের রক্তের ধারার সাথে মিশে প্রবাহিতো হয় ধুলিময় রাজপথে। রফিকের করোটির ফোকর দিয়ে গলগল করে বেরিয়ে আসে বাংলা ভাষার সব অক্ষর অ আ ক খ সমুহ। রফিক চোখের সামনে যেনো সব দেখতে পায়, ফেব্রুয়ারীর সোনালি আলোয় অক্ষর গুলি ঝিকমিক করে উঠে। রাহেলা খানম পানুর মোখটা হয়ত ভেষে উঠে কিছুক্ষনের জন্য। কি যে ভালো লাগে এই শিশার আঘাত টুকু, রফিক তলিয়ে যায় ধিরে ধিরে সেই ভালগালায়।


রাহেলা খানম পানুরা হয়ত গ্রামের বাড়িতে বসে অপেক্ষা করতে থাকে, তার জন্য আলতা সাবান আর আয়না চুড়ি নিয়ে ফিরে আসবে রফিক। কিন্তু তার সেই ফিরা আর হয় না, পানুদের অপেক্ষা করাও শেষ হয় না। রাহেলা খানম পানুর সমস্ত ভালোবাসার এক করুন সমাধি হয়ে যায় মাতৃভাষার তরে, মাতৃভুমির জন্য।


রফিক শফিখ জব্বারদের আত্তত্যাগের জন্যই এখন আমাদের মাতৃভাষা বাংলা আর সেটা বিশ্বের বোকে এক অহংকারের নাম। দেশের জন্য অনেক দিন আগের মানুষেরা অনেক কিছু করে গেছেন। আমারা হয়ত এখন আর তেমন কিছু করার সুযুগ পাইতেছি না। কিন্তু না আমাদের এর চাইতে বেশি সুযুগ আছে। তারা আমাদের হাতে একটি ভাষা উপহার দিয়ে গেছেন। একটি স্বাধীন দেশ দিয়ে গেছেন। 


আমাদের জীবনে হয়ত কখনো কখনো রাহেলা খানম পানুদের মতো ভালোবাসার মানুষ আসে, আমরা তার জন্য রাত দিন কত কত পুথি রচনা করতে থাকি, তার ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে দেশের কথা তো দুরে থাক নিজের কথাই ভুলে যাই। নিজের অনিষ্ট করে বসি কখনো কখনো, কিন্তু একবার ভেবে দেখেছেন কোন এক সময় কোন এক মানুষ তার ভালোবাসা তুচ্ছ করে ছুটে গেছেন  দেশের জন্য, জীবন দিয়েছেন খুব সহযে।   


আমার এখনো জীবনে তেমন রাহেলা খানম পানুর দেখা পাই নাই, আফসুস হলেও সেটাই ভাগ্যের লিখন। দেখা হলে হয়ত তাকে  মনের মন্দিরের সবচাইতে উচু আসনটায় রাখতাম। কিন্তু আমরা মাঝে মাঝে হয়ত কাউকে রাহেলা খানম পানু ভেবে কারো প্রেমে পরে যাই, তারপর সে সকালে কখন উঠলো, কি খেলো, কোথায় গেলো, রাতে ঘুমালো কিনা, কোন হাত দিয়ে খেলো, সে সব আবিষ্কার করতে করতে দিন শেষ করে দেই। দিন শেষে আমারা হয় পানুদের পক্ষ থেকে এক ঝলক ভালোবাসার বাতাস পাই বা কারো কারো কপালে সেটাও জোটে না। এসব অন্ধকার ভালোবাসার পিছনে ভালোবাসা আবিষ্কার করতে করতে আমারা ক্লান্ত হয়ে যাই। ভুলে যাই আমার মাতৃভুমির দৈন্য দশার কথা, মাতৃভুমির প্রতি আমাদের দ্বায়িত্ত কর্তব্যের কথা। যা সব মানব মানবীর ভালোবাসার উর্ধে। সবার আগে মাতৃভুমির প্রতি আমাদের ভালোবাসা কতটুকু তা আবিষ্কার করা দরকার। আর সেই ভালোবাসা লালন ও পালন করে দেশের জন্য, দেশের ভালোর জন্য কাজ করা দরকার। 


তারপর আপনার ইচ্ছা মতো আপনি আপনার রাহেলা খানম পানুর সন্ধান করুন, যে আপনার মিথ্যে মৃত্যুর অভিনয় টুকুও সইতে পারবে না। যদি তেমন পেয়ে যান তাহলে আপনাকে অভিনন্দন, আর যদি না পান, তাহলে দুখের কিছু নাই, মাতৃভাষা ও মাতৃভুমির  প্রতি ভালোবাসা রাহেলা খানম পানুদেরে ভালোবাসাকেও হার মানায়। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট